- চট্টগ্রাম সারাদিন - https://chattogramsaradin.com/ -

বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও নবায়ন ফি

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর দেশে নতুন করে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর সব জেলা প্রশাসককে নতুন লাইসেন্সের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও নবায়ন ফি বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারি নির্দেশের পরও ২০ হাজারের বেশি লাইসেন্স করা ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র জমা না পড়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়া এবং বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। তাই নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে আবেদনকারীর প্রকৃত প্রয়োজন, নিরাপত্তাঝুঁকি ও আইন মানার সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।

অস্ত্র আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকের পর নতুন লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংগঠনটির নেতারা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি লাইসেন্স ফি কমানোর দাবি জানিয়েছিলেন। তবে ফি কমানোর পরিবর্তে লাইসেন্স ও নবায়ন বাবদ নির্ধারিত অর্থ বাড়ানো হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকায় অস্ত্র ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়েছিলেন। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার নতুন লাইসেন্স দেওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করেছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান আহমেদ হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি বিভিন্ন ব্যাংক, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসারের সঙ্গে কাজ করায় এখনো টিকে আছে। তবে সাধারণ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই বিপাকে পড়েছেন।

পুরানা পল্টনের রিপন আর্মস কোম্পানির মালিক মোকাররম হোসেন খান বলেন, এমন দোকানও রয়েছে, যেখানে গত নয় মাসে একটি অস্ত্রও বিক্রি হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (রাজনৈতিক-৪ শাখা) আবেদা আফসারী নতুন লাইসেন্সের আবেদন যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ছোট ও বড় আগ্নেয়াস্ত্রের কয়েকশ আবেদন জমা রয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর এসব আবেদন যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

যেসব শর্তে মিলবে লাইসেন্স

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বড় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ব্যক্তিরা নিজ স্থায়ী ঠিকানার অনুকূলে আবেদন করতে পারেন।

ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন না। আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাজা শেষ হওয়ার পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত অযোগ্যতার বিধান রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বড় অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে টানা তিন বছর প্রতিবছর অন্তত দুই লাখ টাকা করে মোট ছয় লাখ টাকা আয়কর দেওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে। ছোট অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিবছর অন্তত পাঁচ লাখ টাকা করে তিন বছরে মোট ১৫ লাখ টাকা আয়কর দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।

আয়কর রিটার্নের পাশাপাশি পুলিশ ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ইতিবাচক প্রতিবেদন এবং সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

লাইসেন্স ও নবায়ন ফি বেড়েছে

আগে লাইসেন্স করা শটগান ও বন্দুকের জন্য বছরে এক হাজার টাকা এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের জন্য পাঁচ হাজার টাকা আয়কর ধার্য ছিল। এখন তা বাড়িয়ে শটগান ও বন্দুকের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা করা হয়েছে।

এ ছাড়া বার্ষিক নবায়ন ফিও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে শটগান ও বন্দুকের লাইসেন্স নবায়নে ১০ হাজার টাকা এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসির আহমেদ জানান, দেশে ছয়টি প্রতিষ্ঠান আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করে। অস্ত্র ও গুলি বিক্রির জন্য বৈধ দোকান রয়েছে ৮৮টি।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, পিস্তল ও রিভলবারের চেয়ে শটগান, একনলা ও দোনলা বন্দুকের বেচাকেনা বেশি। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, তুরস্ক, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও স্লোভাকিয়ায় তৈরি অস্ত্রের চাহিদাও রয়েছে। পিস্তল ও রিভলবারের দাম সাধারণত দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং শটগান ও বন্দুকের দাম এক থেকে তিন লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব অস্ত্রের দাম পরিবর্তিত হয়।

জমা পড়েনি ২০ হাজারের বেশি অস্ত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ৫৩ হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত লাইসেন্সের অস্ত্র ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে চার হাজার ৮৫৪টি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ৩১ জানুয়ারির মধ্যে লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২৭ হাজার ৯৯৫টি ব্যক্তিগত অস্ত্র থানায় জমা পড়ে। তবে ২০ হাজার ২৮৮টি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি।

শুধু ঢাকা শহরে নিবন্ধিত তিন হাজার ৯৯১টি অস্ত্রের মধ্যে ৭৪০টি জমা পড়েনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নির্দেশের পরও যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো উদ্ধারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে মামলা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে এ পর্যন্ত ১১৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আরও কিছু লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।

আওয়ামী লীগ আমলে দেওয়া লাইসেন্স পুনরায় যাচাই

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ২০ হাজার ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৩০৬ জন লাইসেন্স পেলেও কোনো অস্ত্র কেনেননি।

ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে দুই হাজার ১৫৩টি, সামরিক কর্মকর্তাদের নামে ৯৩৩টি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ৭৭৭টি অস্ত্র রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া লাইসেন্সগুলো পুনরায় যাচাই করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য থানা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) লাইসেন্সধারীদের তথ্য সংগ্রহ করছে।

গণঅভ্যুত্থানে লুট হওয়া অস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের অস্ত্রের পাশাপাশি থানায় জমা থাকা ব্যক্তিগত লাইসেন্স করা অস্ত্রও খোয়া যায়। তবে লুট হওয়া এসব অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে চুরি হওয়া ৫২১টি অস্ত্র জমা পড়েছে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে লাইসেন্স করা ৩৩টি অস্ত্র। তবে ব্যক্তিপর্যায়ের ২১৪টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, অতীতে বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নজির রয়েছে। তাই লাইসেন্স দেওয়ার পর অস্ত্রের ব্যবহার নিয়মিত তদারকি করতে হবে, যাতে কেউ তা দিয়ে জোরজুলুম, চাঁদাবাজি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে না পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরীও বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু লাইসেন্স দেওয়াই যথেষ্ট নয়; লাইসেন্সধারীরা অস্ত্রের অপব্যবহার করছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আবেদনকারীর প্রকৃত প্রয়োজন ও নিরাপত্তাঝুঁকি যাচাই করেই লাইসেন্স দেওয়া উচিত।

সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে লাইসেন্স ফি, আয়করের পরিমাণ ও যোগ্যতার শর্তগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে আয়কর ও লাইসেন্স ফি এক বিষয় নয়—প্রতিবেদনে দুটির পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি।