চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেডে এক নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিবারের ১ লাখ টাকায় ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নবজাতকের স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পরও সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিবারের সম্মতিতেই চিকিৎসা ব্যয়সহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১ লাখ টাকায় বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।
এদিকে, নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুল ছিল কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নবজাতকের বাবা মো. নাঈম উদ্দীন জানান, ২৬ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে চিকিৎসক ডা. ফারজানা আক্তার বিউটির মাধ্যমে তার স্ত্রীকে সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের দাবি, রাত ১টা ২৫ মিনিটের দিকে স্বাভাবিকভাবে নবজাতকের জন্ম হয়। জন্মের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
নাঈম উদ্দীনের ভাষ্য, কিছুক্ষণ পর নবজাতকটি অতিরিক্ত কান্নাকাটি শুরু করলে তাকে বেড থেকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তখন চিকিৎসক জানান, জন্মের সময় শিশুটির কিছুটা ইনফেকশন হয়েছিল। পরে তাকে ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, ইনজেকশন দেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তবে স্যালাইন শেষ করা সম্ভব হয়নি।
নবজাতকের বাবা আরও অভিযোগ করেন, শিশুটির অবস্থার অবনতি দেখে তিনি বারবার চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীদের বিষয়টি জানান। কিন্তু সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিশুর কান্নার বিষয়টি চিকিৎসককে জানালে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন বলেও অভিযোগ করেন নাঈম উদ্দীন।
পরিবারের দাবি, সারা রাত শিশুটির যথাযথ পরিচর্যার জন্য কোনো সেবিকা নিয়মিত আসেননি। শিশুর বাবা বারবার নার্স ও চিকিৎসকদের ডাকলেও তারা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একপর্যায়ে ২৭ আগস্ট ভোর ৬টা ১০ মিনিটের দিকে নবজাতকটির মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানায়। এরপর সকাল ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন নবজাতকের বাবা। পরে কর্ণফুলী থানা পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনাটি গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকে জানানো হলে তিনি কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসাকে ঘটনাস্থলে পাঠান।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডা. জেবুন্নেসা জানান, নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের ভুল বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতালের ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলেন না। পরে হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং নিহত নবজাতকের স্বজনদের অভিযোগ শুনে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। এরপর স্বজনদের সম্মতিতে চিকিৎসা ব্যয়সহ ১ লাখ টাকায় বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর মোহাম্মদ বলেন, নবজাতকের স্বজনরা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানালে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। স্বজনরা টাকা নিয়ে বিষয়টি সমঝোতা করে থাকলে পুলিশের তাৎক্ষণিকভাবে করার কিছু থাকে না। তবে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাউথ চট্টগ্রাম হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেডকে ঘিরে এর আগেও চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৩ সালেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময়ও নিহত নবজাতকের পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ ওঠে বলে জানা গেছে।
