চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে জালিয়াতির মাধ্যমে নিলাম দেখিয়ে পৈতৃক বসতবাড়ি দখল, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজেদের সম্পত্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের পৈতৃক সম্পত্তি আরএস রেকর্ডীয় মালিক আবুল মোহাম্মদের কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে তাদের বাবা মালিক হন। পরবর্তীতে বিএস জরিপে ৩১৩ নম্বর খতিয়ানে তাদের নামে সম্পত্তি রেকর্ডভুক্ত হয়। ১৯৬১ সাল থেকে তারা ওই সম্পত্তি ভোগদখলে রয়েছেন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া সম্পত্তিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদিত প্ল্যান এবং ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
ভুক্তভোগীরা জানান, ১৯৯২ সালে চাক্তাই খাল সম্প্রসারণের সময় সিডিএ তাদের কিছু জমি অধিগ্রহণ করে ক্ষতিপূরণের নোটিশ দেয়। এ সময় আরএস রেকর্ডীয় মালিক আবুল মোহাম্মদের নাতি আব্দুল মাবুদ ওই সম্পত্তিতে নিজের স্বত্ব দাবি করেন। তবে জেলা প্রশাসনের তদন্তে তার স্বত্ব না থাকার বিষয়টি উঠে আসে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, পরবর্তীতে আব্দুল মাবুদ অগ্রণী ব্যাংক, চকবাজার শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ‘চিশতিয়া হক স্টোর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ গ্রহণ করেন এবং তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টার হিসেবে ভুক্তভোগীদের সম্পত্তি বন্ধক রাখেন। তাদের দাবি, ওই সময় আব্দুল মাবুদের নামে সম্পত্তির কোনো আরএস বা বিএস রেকর্ড ছিল না এবং তিনি কখনো ওই জমি ভোগদখলেও ছিলেন না।
এ নিয়ে একাধিক দেওয়ানি মামলা হলে আদালত ভুক্তভোগীদের পক্ষে রায় দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পরে অগ্রণী ব্যাংক ও আব্দুল মাবুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় ২০০২ সালের ১৪ জুলাই আদালত সম্পত্তিতে প্রবেশ, সীমানাপ্রাচীর বা স্থাপনা নির্মাণের ওপর চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আব্দুল মাবুদ ব্যাংককে ৫ লাখ ৪১ হাজার ১৬১ টাকা পরিশোধ করেন। এরপর অর্থঋণ আদালত ২০১২ সালের ২৬ জুলাই আদেশের মাধ্যমে মামলাটি সম্পূর্ণ সন্তুষ্টিতে নিষ্পত্তি করেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর নিষ্পত্তি হওয়া ওই মামলায় রহস্যজনকভাবে নতুন আদেশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের কোনো নোটিশ না দিয়ে নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নিলামে চকবাজার এলাকার প্রায় ১১ গণ্ডা সম্পত্তি, তিনটি ভবন, টিনশেড কলোনি ও গ্যারেজ মাত্র ২০ লাখ টাকায় বিক্রি দেখানো হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পত্তিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। নিলাম গ্রহণকারী হিসেবে চৌধুরী সানিয়া আলমের নাম উল্লেখ করে তারা অভিযোগ করেন, নিলামের আগেই আব্দুল মাবুদ ও সানিয়া আলমের মধ্যে দুটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয়।
নিলামের তফসিলে ছয়টি আরএস দাগে ২১ দশমিক ৬৭ শতক জমি বিক্রির কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ও দখল বুঝিয়ে দেওয়ার বিস্তারিত বিবরণ ছিল না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, নিলামের বাইরে থাকা জমিসহ পুরো সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে তারা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৫ ধারায় মামলা করলে চকবাজার থানাকে বিরোধপূর্ণ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে ওই আদেশ অমান্য করে গত রোববার চৌধুরী সানিয়া আলমের নেতৃত্বে ৩০০ থেকে ৪০০ জন লোক ও অস্ত্রধারী ব্যক্তি বিরোধপূর্ণ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, এ সময় বিভিন্ন ফ্ল্যাটের দরজা ও আলমারি ভেঙে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ ও ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ লুট করা হয়।
এ ছাড়া বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও গর্ভবতী নারীসহ কয়েকজনকে মারধর এবং দারোয়ান রহিমকে রক্তাক্ত জখম করার অভিযোগও করা হয়। ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলে বলেন, বিএস খতিয়ানে নিজেদের নামে রেকর্ডভুক্ত ও নিয়মিত খাজনা দেওয়া সম্পত্তি কীভাবে অন্য ব্যক্তি নিজের বলে দাবি করেন; রেকর্ড ও দখল না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ওই সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রাখা হলো; ২০১২ সালে নিষ্পত্তি হওয়া মামলা কীভাবে ২০২৫ সালে পুনরায় নিলামের পর্যায়ে গেল এবং কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি কীভাবে মাত্র ২০ লাখ টাকায় নিলাম দেখানো হলো।
তারা আরও বলেন, দেওয়ানি আদালতের চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং ১৪৫ ধারার মামলা চলমান থাকা অবস্থায় কীভাবে সম্পত্তিতে প্রবেশ ও দখলের চেষ্টা করা হলো, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
ভুক্তভোগী পরিবার তাদের পৈতৃক সম্পত্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান। পাশাপাশি বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন তারা। এসময় জায়গার মালিক আবুবক্কর, ডা.সেলিনা মেহের ও অন্যান্য মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।









