মাত্র ১৩ বছর বয়সেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা [1]য় ৫৩টি পদক জিতে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের কিশোরী সুপর্বা সুধা বিশ্বাস। অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী পড়াশোনা, গবেষণা, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। সর্বশেষ দক্ষিণ এশীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের পাশাপাশি চট্টগ্রামের মুখও উজ্জ্বল করেছে সে।
সুপর্বা সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের (কেমব্রিজ কারিকুলাম) অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী [2]। একাডেমিক কৃতিত্বের পাশাপাশি খেলাধুলা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ টানা তিন বছর—পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে বিদ্যালয়ের ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দশম ক্যাডেট, জুনিয়র, অনূর্ধ্ব-২১ ও সিনিয়র দক্ষিণ এশীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দ্বিতীয় দক্ষিণ এশীয় অনূর্ধ্ব-১৪ কারাতে কাপে অংশ নেয় সুপর্বা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে সে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ দলে সুযোগ পাওয়া সুপর্বা দক্ষিণ এশীয় আসরে তৃতীয় স্থান অর্জনের মাধ্যমে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। এবারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগে ১৫৪ জন খেলোয়াড় অংশ নেন।
সুপর্বা চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের চক্ষু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. সোমা রানী রায় এবং কর্নিয়া বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন ডা. সুজিত কুমার বিশ্বাসের মেয়ে।
এর আগে ২০২৪ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে কাতা ও কুমিতে দুটি স্বর্ণপদক জিতে আলোচনায় আসে সে। এছাড়া জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও একাধিক পদক অর্জন করেছে। কারাতের পাশাপাশি স্কুলের বাস্কেটবল ও ফুটবল দলেও নিয়মিত খেলছে সুপর্বা।
খেলাধুলার পাশাপাশি গবেষণাতেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক একাডেমিক গবেষণা প্রতিযোগিতায় ‘নিউরোশিল্ড ব্যান্ড—অ্যানেস্থেসিয়ার ঝুঁকি হ্রাসের নতুন ধারণা’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করে বিশ্বের ৩৭টি দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান করে নেয়। এছাড়া ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক অনলাইন গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্য পদক অর্জন করে।
সুপর্বা জানায়, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় নিজেকে দক্ষ করে তোলার স্বপ্ন ছিল তার। বিশেষ করে কারাতের প্রতি ভালোবাসাই তাকে নিয়মিত অনুশীলনে অনুপ্রাণিত করেছে।
তার ভাষায়, “প্রশিক্ষণে কখনো ফাঁকি দিইনি। বৃষ্টি-ঝড় যাই হোক, নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। একই সঙ্গে পড়াশোনাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সবসময় নজর রেখেছি। ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক আসরে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।”
সুপর্বার মা ডা. সোমা রানী রায় বলেন, “সাত বছর বয়স থেকে কারাতে শেখা শুরু করে সুপর্বা। তার নিষ্ঠা ও পরিশ্রমই আজকের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। দক্ষিণ এশীয় পর্যায়ে পদক অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।”
বাবা ডা. সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও সমান মনোযোগ দিয়ে সুপর্বা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা চাই, সে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য বয়ে আনুক।”
জানা গেছে, খুলশী কারাতে ক্লাবে সুপর্বার কারাতে যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও জাপান-প্রশিক্ষিত কোচ তুলু উস সামসের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন থেকে দ্বিতীয় ড্যান এবং জাপান কারাতে অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রথম ড্যান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের মতে, একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণামনস্কতা এবং খেলাধুলায় ধারাবাহিক সাফল্যের অনন্য সমন্বয় ঘটিয়ে সুপর্বা সুধা বিশ্বাস নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় এক উদাহরণ হয়ে উঠছে।
