- চট্টগ্রাম সারাদিন - https://chattogramsaradin.com/ -

৬ হাজার ৮৮০ কোটি কীভাবে ২২ হাজার কোটি টাকা হলো!

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচিটি। মন্ত্রী দাবি করেছেন, আরডিএসের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। তবে ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ঋণ বা বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের সঙ্গে ২২ হাজার কোটি টাকার বিতরণের হিসাব কীভাবে যুক্ত হলো? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উল্লেখ করা অর্থের উৎস, সময়কাল ও হিসাবের ভিত্তি কী?

সংসদে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আওতায় আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আরডিএস ইসলামী ব্যাংকের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়। তার দাবি, নির্বাচনের আগে ভোটকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “এই আরডিএস প্রকল্পের মধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউট হয়েছে। ১১ হাজার কোটি টাকা আগে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর কোনো হদিস নেই।”

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, যেখানে আরডিএস প্রকল্পের বর্তমান আকার ৭ হাজার কোটি টাকারও কম, সেখানে ২২ হাজার কোটি টাকার বিতরণের তথ্য কোথা থেকে এলো।

ইসলামী ব্যাংকের তথ্য কী বলছে

ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আরডিএসের আওতায় সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯২ জন। প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের পরিমাণ ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা এবং আদায়ের হার ৯৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

অর্থাৎ বর্তমানে মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া বা চলমান ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আরডিএসের মাধ্যমে ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়, যার মধ্যে ওই বছরেই আদায় হয় ৬ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা এবং আদায় হয় ৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয় ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিতরণ করা অর্থের বড় অংশই একই বছরের মধ্যে আদায় হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ হলেও বছর শেষে ঋণের স্থিতি ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই থাকে।

‘স্থিতি’ ও ‘বিতরণ’—দুই হিসাব এক নয়

ব্যাংকারদের মতে, আরডিএসের মতো ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রকল্পে একই অর্থ বারবার ঘুরে ফিরে বিতরণ করা হয়। একজন গ্রাহক ঋণ নিয়ে কিস্তিতে পরিশোধ করলে সেই অর্থ আবার অন্য গ্রাহককে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ঋণের স্থিতি এবং কয়েক বছরের মোট বিতরণ—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হিসাব।

তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেই আরডিএসের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি বিতরণ হয়েছে। এর সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসের ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা যোগ করলে মোট বিতরণ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে আদায় হয়েছে ২২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা। ফলে বর্তমানে ঋণের স্থিতি রয়েছে ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি কয়েক বছরের মোট বিতরণকৃত অর্থের হিসাবকে উল্লেখ করে থাকেন, তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তবে যদি তিনি বর্তমান প্রকল্পের আকার বা বিদ্যমান ঋণ স্থিতিকে বোঝাতে এই সংখ্যা ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তা ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে কত টাকা বিতরণ

ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে আরডিএসের আওতায় মোট ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে নভেম্বরে ৬৫৪ কোটি, ডিসেম্বরে ৬৭০ কোটি, জানুয়ারিতে ৫৩০ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৫০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। একই সময়ে আদায় হয়েছে ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক ধারায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম চললেও ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে কোথাও ১১ হাজার কোটি কিংবা ২২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বিতরণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

মূল প্রশ্নের উত্তর কোথায়

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ইসলামী ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের সংখ্যাগত পার্থক্য দেখা দেওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন একটাই—২২ হাজার কোটি টাকার হিসাবটি কোন সময়ের, কোন ভিত্তির এবং কোন উৎস থেকে নেওয়া?

বর্তমানে আরডিএস প্রকল্পে ঋণের স্থিতি ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মোট বিতরণকৃত অর্থ যোগ করলে তা ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। ফলে ‘বিতরণ’ এবং ‘ঋণ স্থিতি’—এই দুই ভিন্ন হিসাবের মধ্যে বিভ্রান্তি থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, বিষয়টি পরিষ্কার করতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকার দাবির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন